আজ ৩০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ১৪ই আগস্ট, ২০২০ ইং

উত্তর বাংলার ভাওয়াইয়া ও লোকজ সংস্কৃতি

আনিছুর রহমান মিয়াজী।।
ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ভাওয়াইয়া কোনো এক সময় উত্তর বাংলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়ে আজ দেশের শহর বন্দরেও পরিবেশিত হচ্ছে, হাজারো দর্শক শ্রোতার মাঝে করতালে। শুধু দেশে শহর বন্দরে নামি-দামি মঞ্চে নয়, বিদেশের মাটিতেও পরিবেশিত হচ্ছে ঢাক-ঢোল, বাঁশি আর দোতরার বোলে। শুধু তাই নয় আসামের গোয়ালপাড়া থেকে লন্ডনে বিবিসি’র বিশেষ অনুষ্ঠানমালায় মোহনীয় সুর ঐশ্বর্যে ভাওয়াইয়া পরিবেশিত হচ্ছে। সারা বিশ্বে শুনছে লাখ কোটি ভাওয়াইয়া দর্শক শ্রোতা। হিমালয়ের পাদদেশীয় তরাই অঞ্চল থেকে হাঁকাও গাড়ি চিলমারী বন্দর পর্যন্ত ভাওয়াইয়ার শেকড় শুধু বিস্তৃত থাকলেও এখন এর শেকড় চারিদিকে দেশ থেকে দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘ওকি গাড়ীয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ী তুমি চিলমারীর বন্দরে’, কিংবা ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে’ ভাওয়াইয়া গানের এই সুরলীলা ভাওয়াইয়া প্রেমিক মানুষের মাঝে ক্ষণে ক্ষণে দোলা দেয়। গরুর গাড়ি কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলা থেকে প্রায় হারিয়ে গেলেও চিলমারী বন্দরে সেই গরুর গাড়ি আজ দেখা না মিললেও ভাওয়াইয়া গানে সেকালের আবহমান গ্রাম বাংলার সেই চিরায়ত লোকসংস্কৃতি বহমান। সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ, রূপ ঐশ্বর্য আর এ অঞ্চলের মানুষের সহজ-সরল জীবনযাত্রার নানা অনুষঙ্গ বাঙালি জাতিকে করে তুলেছে সংগীতপ্রবণ। আর তেমনি করে ভাওয়াইয়া সংগীতের মধ্যদিয়েই বাঙালির উত্তর বাংলার মানুষের আত্মপ্রকাশ। অনেকের মতে এ কথা সত্য যে, বাঙালির গান গাওয়ার শুরু ঐতিহ্যবাহী লোকসংগীত ভাওয়াইয়ার যাত্রা আদিকাল থেকে। শ্যামল সবুজ উত্তর বাংলার জনপদে বন বাগানে দোয়েল শ্যামা আর কোকিলের কুহু-কুহু ডাক। নদনদীতে মাঝির পাল তোলা নৌকা উজান টানে কিংবা দাঁড় টেনে পারাপার করে দুই পাড়ের মানুষ। যদিও এখন সেই সব পাল তোলা আর দাঁড় টানা নৌকা নেই, কালের বিবর্তনে এসব হারিয়ে গিয়ে যন্ত্রচালিত নৌকার পরিবর্তন হয়েছে। তারপরও নৌকায় করে জেলেদের জাল নিয়ে মাছ ধরা, দোতরা হাতে নিয়ে কৃষক আর রাখালদের ভাওয়াইয়া গান- ওকি গাড়িয়াল ভাই হাঁকাও গাড়ি তুমি চিলমারীর বন্দরে। এক সময়ের দুঃখ বেদনা ভরা আজ পরিবর্তনে আনন্দ আর হাসির মাঝে উত্তর বাংলার মানুষের হাসি কান্নার সাথে এ দুটিই বাঁধা। হাসির তুলনায় কান্না ভরা বেদনা উত্তর বাংলার মানুষের সেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় রংপুর অঞ্চলের মানুষের লোকজ সংস্কৃতি আজ বিলুপ্তির পথে। মানুষের জীবন চেতনা ও লোকজ সংস্কৃতি একই সূত্রে গাঁথা। তারপরেও প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক কারণে এ অঞ্চলের মানুষের প্রকাশ ভঙ্গিতে কিছুটা হলেও লক্ষ্য করা যায়। বন্যা, খরা আর নদনদী ভাঙনে বিশেষ করে কুড়িগ্রাম জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষ আজ বিপর্যস্ত। দারিদ্র্যতা আর হতাশা এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী। সর্বনাশা করালগ্রাসী ব্রহ্মপুত্র নদ, তিস্তা ও ধরলা নদী গ্রাস করছে এ জেলার বৃহৎ এক জনপদ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর নদনদী ভাঙনে দিশাহারা নীড় হারা এ এলাকার মানুষগুলো বর্তমানে জীবন সংগ্রামে ছুটছে রাজধানী ঢাকা বা তার পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে কলকারখানায় শ্রমিকের সেজে। মাসের পর মাস কাজ করে অর্থ উপার্জন করে নিজ ঠিকানার ফেরে নীড়ে।
এসব দুঃখ-বেদনা ভরা এ অঞ্চলের মানুষগুলোর মাঝে বিরাজিত থাকলেও অনেক আগ থেকেই লক্ষ্য করা গেছে কোথাও কোনো গায়ক কিংবা শিল্পীর ভাওয়াইয়া গানের আসর জমলে তা হয়ে ওঠে মানুষের অন্তরে এক আনন্দ। এ অঞ্চলের সিংহভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে কৃষিক্ষেত্রে লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া আর কিষাণি গানে প্রভাব পড়েছে বেশি। এ অঞ্চলের অনেক মানুষের একদিকে নদনদী জীবিকার উৎস হলেও অপরদিকে নদী তীরবর্তী সিংহভাগ মানুষের জীবনে তা মূর্তিমান অভিশাপ। লোকসঙ্গীতে নদনদীর এই অভিশাপের প্রভাব লক্ষণীয়। এ ছাড়া এ অঞ্চলের ঐতিহ্য লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া প্রধান আকর্ষণ ও আনন্দ হলেও এর পিছনে উঠে এসেছে স্বপ্ন ভঙ্গ ও বেদনার কথা। সেই বেদনা অন্তরের গভীরে গোপন রেখে এই অঞ্চলের মানুষ লোকসঙ্গীত, ভাওয়াইয়া, রাখালী আর কিষাণি গান গায় অবলীলায়। খেতে খামারে কৃষি কাজে এবং অবসরে উঠানে বসে লোকসঙ্গীত ভাওয়াইয়া, রাখালী আর কিষাণি গানের আসর জমিয়ে তোলে গায়কেরা। এ অঞ্চলে ভাওয়াইয়া গান ছাড়াও পালা গান, কেচ্ছা বন্দি গান, রাজা মানিক চাঁদ, গুপিচাঁদ. রাজমাতা ময়নামতির স্মৃতিমাখা গানেও তারা জমিয়ে তোলে খেত খামার কিংবা উঠানের আসর। বর্ষাকালে নদনদীতে পানি ভরে উঠলে নৌকা বাইচে সারি গান আর জারি গান তাদের মহাবিষ্ট করে। এমনো এক সময় ছিল সারা রাত জেগে শুনতো জাগের গান, পালাগান, যোগীর গান, মোনাই যাত্রা, ভাসান যাত্রা, কৃষ্ণলীলা, বেহুলা ও বালা লক্ষ্মীন্দরের গান, মলিশী, ও ছোকরা নাচের গান। এ অঞ্চলের সেই সব সংস্কৃতি আজ কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত প্রায়।
উওর বাংলার প্রাচীন জনপদগুলোতে এখনো খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃতিভিত্তিক আঞ্চলিক বারো মাসি গান, নদনদীভিত্তিক ভাটিয়ালি, আর পালা গান। আরও পাওয়া যায় বাউল গান, কীর্ত্তন বন্দি, শ্যামা সংগীত গান, জারি ও সারি গান, মুর্শিদি, মারফতি, লালনগীতি, কবিগান, পল্লীগীতি, যাত্রাপালা, বিয়েরগীত, লাঠিখেলা, পুঁথিপাঠ, লোকনৃত্য, বৌ বস করা গান ও ধুয়া গান। এ ছাড়াও রয়েছে নিজস্ব ঘরনার গান, ছোকড়া নাচার গান, উদাসীনি গান এ অঞ্চলের মানুষকে আজও প্রবলভাবে উদ্ভাসিত করে। উত্তর বাংলা বিশেষ করে রংপুর অঞ্চল মূলত ভাওয়াইয়া প্রভাবিত অঞ্চল। যদিও গাড়িয়াল ভাই ও মইষাল বন্ধু আমাদের চারপাশের চেনা জানা কোনো কেউ নয়। তারপরেও ভাওয়াইয়া গানে উজ্জীবিত করে গাড়িয়াল ভাই ও মইষাল বন্ধু কাছের কোনো আপনজনকেই টেনে আনে। তাই ভাওয়াইয়া আমাদের ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। এ ছাড়া ভাওয়াইয়ার কাছাকাছি ‘উদাসিনী বলে দীর্ঘ সুরের এক ধরনের গান এ অঞ্চলের নিজস্ব সংস্কৃতি বলে মনে করা হয়। উওর বাংলার লোকসঙ্গীতের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নারীত্বের অবদমিত কামনার রূপ পুরুষ কণ্ঠে গীত হওয়া। দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মতো উত্তর বাংলার প্রেমের গানেও রয়েছে বিরহ বেদনা। বহুল প্রচলিত ভাওয়াইয়া গানে তাই প্রকাশিত হয়, তিস্তা নদী উথাল পাতালরে ও মোর ভয়ে কান্দে হিয়া/ওরে আসিবার কথা দয়ার দাদা ও মোক নাইওর যাইবেরে নিয়া/ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দেরে/ওরে গাড়িয়াল বন্ধুরে, বন্ধু ছাড়িয়া রইতে পারিনারে/পতিধন একনা কথা কবার চাউও, ভাইয়ের বাড়ি যাবার চাউও/ওরে পারা সীতা মোর আউলেল বাতাসে, ওরে বান্ধা সীতা মোর আউলেল বাতাসে/ থাক থাক থাক দেরারে তুই ভাবনা করিসনা তোর বাদে মুই জুড়িয়া থুইছো সুন্দরী কন্যা/ওরে কুতিবা যান মোর প্রাণের কালারে, ও কালা আসিবেন কোন বেলা। অপরদিকে বারো মাসি প্রকাশিত গানেও প্রস্ফুটিত ‘বসন্তে বয়রে দক্ষিণা বাও/মিঠা মিঠা লাগে যুবতীর বয়সকালের আও/ একে তো বৈশাখ মাস জমিতে নালিতা শাক/ সব সখি খায় মোর মোখে তিতা/ এই মাস গেল সাধু না পুরালেন আঁশ/যুবতীর জীবন ধরি নামিল জ্যৈষ্ঠ মাস/ আইল আষাঢ় মাস গাঙ্গে ভরা পানি/ বাণিজ্য করবার গেলেন সাধু খবর নাইরে জানি’।
উওর বাংলার গ্রামাঞ্চলে একদা ছোকরা নাচ বা মালসী নামে এক গান ছিল। বয়স্ক মানুষদের স্মৃতিতে ছাড়া এই গান এখন আর তেমন কাউকে গাইতে শোনা যায় না। গিদাল ও দোহারের গানের মাঝে ছোকড়া এই গানের সাথে নাচ পরিবেশন করত। উত্তর বাংলার লোকসঙ্গীত পালাগানও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বহন করে। উওর বাংলার লোকসঙ্গীতকে জিইয়ে রাখতে হলে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে লোকসঙ্গীত বিদ্যালয় স্থাপন করে লোক সংস্কৃতি ভাওয়াইয়াসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন লোকজ সংগীতের জন্য গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত করা দরকার বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। ভাওয়াইয়া নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার ভাওয়াইয়াকে উজ্জীবিত করে রাখতে প্রতি বছর রাজ্য ভাওয়াইয়া উৎসব পালন করেন। ভাওয়াইয়া নিয়ে সেখানে চলছে নানা গবেষণা। বাংলাদেশে লোকজ সংস্কৃতি চর্চায় ১৯৮৭ সালে কুড়িগ্রামের উলিপুরে বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হলেও সরকারের সুদৃষ্টির অভাবে এগুতে পারছে না এ সংগঠনটি। লোকজ সংস্কৃতির ঘ্রাণ থেকে উওর বাংলার মানুষ অনেকদূর পিছিয়ে রয়েছে শুধু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে। উওর বাংলার অন্যতম লোকজ সংগীত ভাওয়াইয়ার আছে ঐতিহ্য, আছে দুঃখ বেদনা আর হাসি কান্না ভরা ইতিহাস। সেই সব ঢেকে থাকা ইতিহাস খুঁজে বের করে আলোতে প্রজ্বলিত করলে হয়তো এই লোকসঙ্গীত থেকে অনেক কিছুই পাওয়া যেতে পারে বলে গুণীজনের ধারণা। বিষয়টির প্রতি সরকার সুদৃষ্টি দিলে হয়তো গুণীজনের ধারণায় প্রতিফলিত হবে আর এতে করে উত্তর বাংলার সংস্কৃতি অঙ্গন আলোয় আলোকিত হবে এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

আনিছুর রহমান মিয়াজী : লেখক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ জাতীয় আরও খবর.......

এ সপ্তাহের পত্রিকা

খবরটি বেশী পড়া হয়েছে

Don`t copy text!