আজ ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ ইং

আহবান

আহবান

…………………………………………..

শফিউল ইসলাম।।

বন্ধু কালামের একটা কাজে কলেজ হতে সোজা জজ কোর্টে যাচ্ছিলাম দু’জনে অটো বাইকে চড়ে। পথে অনেক যাত্রী উঠছে আবার অনেকে নেমে যাচ্ছে। দারিয়াপুরে পৌঁছে গাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল। পিছনের ছিটে শুধু আমরা দু’জন রইলাম। ড্রাইভার বাইক হতে মাথা বের করে এ গাইবান্ধাÑ গাইবান্ধাÑ বলে জোরে আওয়াজ তুলতে লাগল। সামনে তাঁকাতেই চোখে পড়ল মলিন ছেঁড়া কাপড় পরিহিত অশিতিপর এক বৃদ্ধা ছড়িতে ভর দিয়ে মাথা উঁচিয়ে গাড়িতে ওঠার জন্য হাত তুলছে কিন্তু তাকে কেউ ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য যাত্রী তুলছে। বৃদ্ধা গাড়ির কাছাকাছি আসার আগেই কয়েকজন যাত্রী এসে গাড়িতে চেপে বসল। যাত্রীদের একজন বিড়ি টানছিল আমাদের দিকে তাকিয়ে বোধহয় ভদ্রলোক ভেবে মনে মনে একটু আরষ্ট হয়ে জোরে একটা শুক টান দিয়ে শেষ হবার আগেই বিড়িটা বাইরে ছুড়ে দিল। আমাদের ছিট ছাড়া আর বসার জায়গা রইল না। বৃদ্ধা গাড়ির কাছে এসে বাম হাতে ছড়িতে ভর দিয়ে ডান হাত দিয়ে গাড়ির রড ধরে ভিতরে ওঠার চেষ্টা করল বটে কিন্তু সফল হলো না। বৃদ্ধার গাড়িতে ওঠার চেষ্টা দেখে আমাদের সামনে বসা এক যাত্রী বলল, চাচী. তোমরা পরের গাড়িত আসেন বাহে! দ্যাখেন না এখানে সিট নাই!
বৃদ্ধা সহজ সরল ভঙ্গিতে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,বাবা,মুই বুড়া মানুষ গো! অনেকক্ষণ থাকি খাড়া হয়্যা আছোম! মোর কথা কেউ শুনবারে চায়না। ওতি একনা সরো, মুই তোমার ঘরে সাথে যাম।
বৃদ্ধার আকুতি যেন আমার কানে বাজতে লাগল। তাই আর অন্য কিছুু না ভেবে হাত বাড়িয়ে তাকে গাড়িতে তুললাম।
গাড়ি ছেড়ে দিল। বৃদ্ধা একটু নড়ে চড়ে বসে তার ছড়িটা নিচে রেখে দিয়ে ব্যাগটা কোছায় রেখে শিশু সুলভ দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকাল। তারপর আমার হাঁটুেত হাত রেখে স্নেহসুলভ ভঙ্গিতে বলল,আল্লাহ তোমার ভালো করুক বাবা।
আমি সহাস্যে মাথা নিচু করে তার দিকে তাকিয়ে বললাম,খালা,কোথায় যাবেন?
সে বলল, বাবা, গাইবান্ধা পার্কোত, আটা আনবার যামো।
বৃদ্ধা আমার কথার উত্তর দিতে দিতে কাঁপা কাঁপা হাতে থলে থেকে টাকা বের করে আলাদা করতে লাগল। এরপর হেলিয়ে পড়া কপোল ভরে আবারও একটি শিশু-সুলভ হাসি দিয়ে আপন মনে বির বির করে বলতে লাগল,বাবা,গাড়ি ভরার টাকাটা খালি হাতোত থাক। আইস্যার সময় অ্যালা হাটি হাটি আসিম। কি করমো বাবা! আল্লাতালা নেয়ও না! যে দু’দিন বাঁচি আছি এদ্যান করিই চলা নাগবে।
বৃদ্ধা কথাগুলো বলে যেন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচল। মাথা তুলে এদিক ওদিক তাঁকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রইল।
পাশে বসা একজন বলে উঠল, ক্যা বুড়ার বেটি, বয়স্ক ভাতা, তারপর দুস্থমাতার কার্ড-টার্ড তোমার মেম্বরে করি দ্যায় নাই?
লোকটির কথা শুনে বৃদ্ধার ভেতরে চেপে রাখা কষ্টের কথাগুলো গড় গড় করে বেড়িয়ে এলো। সে বলল, বাবারে, মোর হাতা-মাতা কেউ নাই! নেম্বর-চিয়ারম্যান কও আর আশপাশের বড় নোক কও-কেউ মোর দিকি দ্যাখে না! বানের পানি মোর ঘরোত হাঁটু নাখান হছিলÑ কেউ একবার দ্যাখবারও আইসে নাই। দুই দিন ধরি গ্রামোত যাবার পাম নাই। শ্যাষ ম্যাষ প্যাটের কষ্ট আর সহ্য করবার না পায়া দারিপুর বন্দোরত দোকানে দোকানে ঘুরিয়া জেবনটা বাচাছোম।
কথাগুলা বলতে বলতে বৃদ্ধা হাঁপিয়ে উঠল এবং দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। কাঁপা কাঁপা হাতে আঁচল দিয়ে চোখ মোছবার চেষ্টা করল। কিন্তু আঁচলখানা সিটের নিচে পড়ায় বৃদ্ধা সহসা তা টেনে তুলতে পারল না। বৃদ্ধার ভাঁজ পড়া কপোল বেয়ে অশ্রুর ফোঁয়ারা যেন বয়ে যেতে লাগল। মনে হলো, কোন ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্যামেরা যেন দর্শকদের উদ্দেশ্যে উত্তর মেরুর বরফ গলার দৃশ্য লাইভ দ্যাখাচ্ছে।
কিছুক্ষণ পর কান্নাজড়িত কণ্ঠেই বলল, আল্লায় যে কয় দিন হায়াত দিছে সে কয়দিন মানষের দুয়ারে দুয়ারে চায়া মাঙ্গিয়াই খাইম।
গাড়ির সবাই নির্বাক। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা গন্তব্যে নেমে পড়লাম। বৃদ্ধা তার হাতের তালুতে চেপে রাখা টাকাটা বের করে ড্রাইভারকে দিতে লাগল। ড্রাইভার টাকাটা হাতে নিয়ে আবার বৃদ্ধার হাতেই গুঁজে দিতে দিতে আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলল,খালা ,তোমার ভাড়া ঐ ভদ্রলোকে দিছে।
ড্রাইভারের কথা শুনে বৃদ্ধার মুখ আনন্দে ভরে উঠল এবং আবেগে চোখ ছলছল হয়ে উঠল। ছড়িতে বাম হাতে ভর দিয়ে ডান হাত উপরে তুলে কি যেন বলতে লাগল।
আমরা রিক্সায় উঠে বসলাম।
‘আল্লা তালা ওই মিয়ার ব্যাটাক ধন-দৌলতে ভরে দেউক’-কথাটা কানে ভেসে আসতেই আমার বন্ধু কনুই দিয়ে আমার পেটে ঠেস দিয়ে হাসতে লাগল।
বন্ধু কী ইঙ্গিত করলো তা আমি বুঝতে পারলেও ঐ বৃদ্ধার বোঝার কথা নয়। কারণ যুগ যুগ ধরে লালিত ধর্মান্ধতা আমাদের অস্তি-মজ্জায় এমনভাবে মিশে আছে যা আমরা উচ্চ ডিগ্রিধারিরাই হর হামেশয়ায় তার চর্চা করি। শ্রষ্টার সর্বোচ্চ সম্মানের স্থান নিরীহ মানুষদের গৃহকোণ কিন্তু তার অপলক দৃষ্টি সব সময় অট্রালিকার দিকে। শীতে-গ্রীষ্মে -বর্ষায় ঘরের মানুষদের নিত্যকার খবর নেয়ার তিনি ফুসরতই পান না। ঐ অশিতিপর বৃদ্ধার পক্ষে বন্ধুর এমন বস্তুনিষ্ঠ ইঙ্গিত বুঝে ওঠা কল্পনারও বাইরে। একবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয় দশকে দাঁড়িয়েও আমরা এখনও চাঁদে মানুষের ছবি দেখা যায়-এমন খবর মসজিদের মাইকে প্রচার করি। আর সেই খবর শুনে উচ্চ ডিগ্রিধারি মানুষরা যারা সুশীল সমাজের অন্তর্ভূক্তির শুধু না বুদ্ধিজীবির দাবিদার, তারা বৃদ্ধার মত সরল মানুষদের ধর্মানুভূতিতে সুরসুরি দেয়। অসহায় ছিন্নমূল সর্বহারাদের আকুতি যে স্রষ্টা কখনও শুনবেন না-তা বৃদ্ধাদের মত সজ্জনদের বোধগম্যের বাইরে।

যাক্ সেকথা। অনেকদিন গত হয়েছে। জীবনের কর্মচাঞ্চ্যল্যে বৃদ্ধার কথা প্রায় ভুলে যেতে বসেছি । নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি। শীত প্রায় চলে এসেছে। বিকেল বেলায় হালকা শীতের কাপড় গায়ে জড়িয়ে পারিবারিক একটা কাজে তাড়াহুড়া করে ঘর হতে বের হচ্ছি। এমন সময় বাড়ির পার্শে¦র লালবাবুর মা এসে বলল, গো ভাইজান, একটা বুড়ি কেমা হামার বাইড়াগে আসি পলের পুঞ্জের গোড়াত শুতি আছে।তার তো কোন হ্যাট উকাশ বোঝা যায় না। আম্মায় কলো, তোমাক ডাকে আনবার।
লালবাবুর মার কথায় মনে মনে একটা উঠকো ঝামেলা বোধ করলাম। তারপরও বললাম, ঠিক আছে। চলো।
ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি দু,জন মহিলা বৃদ্ধাকে পাজাকোলা করে উত্তর-দক্ষিনে শোয়াচ্ছে। আমাকে দেখে মহিলা দু,জন একটু স্বস্তি পেল। আমি কি করবো তা দেখার জন্য দু’জনে উৎসুক হয়ে রইল।
মহিলারা আমার খুব কাছের প্রতিবেশি। আমার ভদ্রলোকি ভাব দেখে ওরা নাকে-মুখে আঁচল গুঁজে দিল।
বৃদ্ধার কাছাকাছি যেতেই একটা উৎকট গন্ধ নাকে ঢুকল। ভিতরে ভিতরে একটু অস্বস্তিবোধ করতে লাগলাম। কিন্তু ওদের বুঝতে না দিয়ে বৃদ্ধার হাত চেপে ধরে রক্ত সঞ্চালন বুঝবার চেষ্টা করলাম। আমার বার বছরের ঔষধের ব্যবসার অভিজ্ঞতার আলোকে বুঝতে পারলাম, এখনও সে মরেনি।
দাঁড়িয়ে মহিলাদের বললাম,তাড়াতাড়ি একটু মহিলার শরীরটা গরম করার চেষ্টা করেন এবং যদি পারেন তো- বলেই আটকে গেলাম। কারণ, মহিলাকে ডাক্তার দ্যাখা দরকার বা হাসপাতালে নেয়া দরকার -এমন কথার উত্তরে আমারই উপরে দায়িত্ব বর্তায়। কি করবো ভেবে পাচ্ছিনা। এদিকে আবার নিজের কাজের তাড়া মাথায় কাজ করছে। কিন্তু কি বলে সেখান থেকে কেটে পড়বো-সেকথাও মাথায় আসছে না।
কাজেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
মহিলা দু’জন আমার মুখপানে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে রইল।
লালবাবুর মার কথায় কিছুটা সম্বিত ফিরে পেলাম। সে বলল, গো ভাইজান, একনা পানি বুড়িটার মুখোত দিয়া দ্যাখেন না ক্যা , না হয় নেম্বর-চিয়ারম্যানোক খবর দ্যাও।
মহিলাদের একজন শিপনের মা। সে বলল,তোরায় প্রবেসার মানুষ। হামরা মূর্খ মানুষগুলা কী বুদ্ধি বাইর করমো ? চেনা পরিচয় যদি থাকিল হয় তেসেননিয়া না হয় ভ্যান ভাড়া করি তামার বাড়িত পঠে দিনো হয়।
আমার আসতে দেরি দেখে স্ত্রী ঘটনাস্থলে এসে হাজির। সে সবার নিরবতা দেখে বিস্মিত হলো। আমার কাছাকাছি এসে কানে কানে বলল,মারা গেছে নাকি!
আমার কাছে সদুত্তর না পেয়ে লালবাবুর মা’র দিকে এগিয়ে গেল।
কয়েক মুহূর্তের নিরবতায় যেন চারপাশের বাতাস ভারি হয়ে এলো।
এমন সময় পার্শ্বের খামারের মুরগিগুলোর বিকট চিৎকারে যেন প্রকৃতির মধ্যে একটা গতি সঞ্চার হলো। মুহূর্তেই উপস্থিত সবার কান ঝালাপালা হয়ে উঠল।
আমার স্ত্রী মহিলার কাছাকাছি যেতে দেখে আমিও এক পা-দু’পা করে এগিয়ে যেতে লাগলাম। পিছনে না তাকিয়েও অনুভব করলাম সবাই আমাকে অনুসরণ করছে। এমন সময় বৃদ্ধা একটু নরেচরে উঠল এবং ক্ষীণভাবে দু’চোখের পাতা মেলল।
এ দৃশ্য দেখে সবার মধ্যে একটু আশার সঞ্চার হলো। কথা না বলে সবাই পরের দৃশ্য দেখার অপেক্ষা করতে লাগলাম।
‘এ কই গেলু রে লালবাবুর মা’-বলে জাহাঙ্গীর বাড়ি হতে চেঁচিয়ে উঠল।
জাহাঙ্গীরের উচ্চাওয়াজে সবাই বিরক্তবোধ করল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে সাহস পেল না।
রিপনের মা মুখে আঁচল গুজিয়ে বলল,ঔ কোহিনুর,যা-যা-রই,তোর পায়রা আসি গ্যাছে।
এবারে সবাই হেসে উঠলেও লালবাবুর মা মুখটা গোমরা করে বলতে লাগল,মরাটা আসিয়াই গালা খ্যান ফাট্টার ধচ্ছে। একনা নিকাশও ন্যায় না।
আমি এসব কথায় কান না দিয়ে বৃদ্ধার দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলাম এতক্ষণ। এবারে বৃদ্ধা একটু নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করল কিন্তু পারলো না। আমি এবার আর স্থির থাকতে পারলাম না। কাছে গিয়ে বৃদ্ধাকে আলতো করে ওখানেই বসিয়ে দিলাম। বৃদ্ধা আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল,অ্যালায় মচ্ছুনু বাবা! বিয়ানায় এক বাটি খালি পানি খায়া বাড়াছোম। আইত জ্বরার জন্য গাও খ্যান খালি গুদ গুদায়। একনা শস্যার দানা হাতে ঘরোত নাই!
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা! তারপর ঢুকি চিপিয়ে জ্বিহ্বাটা ভিজিয়ে নেবার চেষ্টা করল।
আমি বললাম,ক্যা বুড়ি মা,তোমার স্বামী-সন্তান কেউ কী নেই?
এবার আরও নিবিড়ভাবে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,মোর কোনো জন নাই বাবা ! দ্যাশোত গ-গোলের সময় ওমরা ঢাকাত ঠেলা গাড়িত বস্তা তুলি দ্যাওয়া কাম করছিল মোর এক ভাইসহ। কত দিনÑকত রাতÑ লোকটার জন্য ঘাটার দিকি চায়া দুয়ারোত বসি যাদুক কোলোত নিয়া রাত কাটাছোম ! মোর সোনা ফিরি আইলো না। তখন থাকিই মোর কপালোত আগুন নাকছে।
আবার কিছুক্ষণ নিরবতা! তারপর আবার শুরু করল। মোর যাদু আইজাও বাঁচি থাকলে তোমার ধরাণে হতো! তাকেও মন্নের তুফানে খায়া ফেলাল! গাছটা ভাঙ্গি ঘরের চালসুদ্দায় মোর গায়োত পড়! তাক না পড়ি পল্লো মোর যাদুর উপর!
আট মাসি ছোল কি আর অতো ভর সবার পায়! এরপর বৃদ্ধার অশ্রুশূণ্য রোদন কে দ্যাখে? উপস্থিত সবাই নিরব হয়ে শোনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিলো না।
সারাটা দিন যেক্না ক্ষ্যামতা কুলায় ওক্না দিয়াই দুই বাড়ি ব্যাড়াম। একনা নুন হাতে আশপাশের কারো কাছে পাম না। মোকে এ্যাগলা কষ্টোত খোদাতাল্ল আকছে।
কিছুক্ষণ নিরব থেকে চোখ দু’টো স্থির করে দূর আকাশের পানে তাকিয়ে রইল।
বৃদ্ধার আত্মবিলাপে আমার ভিতরে কোথায় যেন খোঁচা অনুভব করলাম। উপস্থিত সবার নিরবতার মধ্য দিয়ে আশেপাশের বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠল। তার হৃদয়ে জমা বেদনাগুলো প্রকাশ করার মধ্যে চোখের কোনায় একফোঁটা জলও জমেনি। মনে হলো জৈষ্ঠ্যের খররৌদ্র বৃদ্ধার পাষাণসম দুঃখ তার ভিতরের সব জল অনেক আগেই শুষিয়ে নিয়ে গেছে।
আমার ভিতরে খোঁচার যন্ত্রনাটা আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। কিন্তু নিজের কাজে যাওয়ার তাড়নায় আর দেরি করতে মন সায় দিলো না। বৃদ্ধাকে শুইয়ে দিয়ে রিপনের মাকে দেখতে বলে স্ত্রীকে বাড়িতে যাওয়ার ইঙ্গিত করলাম।
কয়েক কদম সামনে এগিয়েছি। এমন সময় পিছন হতে ‘গো বড় আব্বু’ বলতে বলতে ভিটার দিক হতে দৌড়ে এসে আমার হাতে একটি ছড়ি দিল লালবাবু। ওটাকে হাতে নিতে একটু ইতস্ততঃ করছিলাম। কিন্তু ওটার মাথা পিতলের শক্ত আবরণ দ্বারা আবৃত হওয়ায় ভিতরে একটু আগ্রহ বেড়ে গেল। ছড়িটাকে আলোমুখ করতেই বেস্টিত আবরণটির উপর পশ্চিম-দক্ষিণ প্রান্তে হেলে পড়া সূর্যালোক লম্বভাবে পতিত হওয়ায় চক্ চক্ করতে লাগল।
তারপর বলল, বড় আব্বু, চিকার ঘরে বাড়ির কুত্তাটা আছে না!
আমি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালাম।
“ওইট্যায় এ্যাটা মুখোত নিয়া নটোর-পটোর করবার নাকছে! মুই দেখিয়া একটা ঢ্যাল মারতে ওটা থুয়া মারছে দৌড়!’’ কথাগুলো বলতে বলতে সে যেন বিশাল কিছু অর্জন করার হাসি হাসলো।
ছড়ির চক্চক্ করা আলোটা মুহূর্তেই আমার মনের ভিতর সার্চ লাইট ফেলিয়ে জানান দিল যে,এই ছড়িটা এই বৃদ্ধার! সেই কয়েক মাস আগে শহরে যেতে অটোবাইকে যে মহিলার সাক্ষাৎ হয়েছিল সে এই মহিলা! মহিলা বাইকে বসে ছড়িটা নিচে পায়ের কাছে রাখার সময় আমার জুতায় লাগায় দৃষ্টিটা ভালোভাবে ওটার দিকে পড়েছিল। তাই ভিতরে একটু সাহসবোধ করলাম।
পকেট হতে ফোন বের করে বন্ধু কালামকে ফোন করে ডাকলাম। সে ঘটনাস্থলে আসার পর আরও নিশ্চিত হলাম। আর ততক্ষণে বৃদ্ধা একটু শরীরে জোরবোধ করে একাই বসে থাকতে পারছে।
তারপর আর কি? একটা ভ্যান ডেকে আনলাম এবং বন্ধুর পরামর্শ মোতাবেক ভ্যানওয়ালাকে বলে দিলাম বৃদ্ধাকে পৌঁছে দিতে।
ইতিমধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়ে গেছে। বৃদ্ধার একটা সদগতি দেখে অনেকে সন্তুষ্ট চিত্তে ফিরে গেল। লোকজনের উপস্থিতি কমে গেলে ভ্যানওয়ালাকে ভাড়াটা পকেটে গুঁজিয়ে দিতে দিতে ছোট করে বললাম,একটু দেখে-শুনে নিয়ে যেও।

সেদিন আর নিজের কাজে যাওয়া হয়নি। রাত্রে স্ত্রী কথা প্রসঙ্গে হাসতে হাসতে বলল,ঐ মহিলার সাথে তোমার পূর্বজন্মের কোন বন্ধন আছে বলে আমার মনে হয়।
আমি মৌখিক হাসি হেসে বললাম,আরে কি সব বলো!
এবারে সে সিরিয়াসলি বলতে লাগল, শোন, তুমি যাই ভাবো না কেন- ঐ মহিলাটার জন্য কিছু একটা করা তোমার উচিত।
তর্কে না গিয়ে শুধু বললাম,সমাজে ওরকম লক্ষ লক্ষ বৃদ্ধা তো আছে। একার পক্ষে ক’জনার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব! রাষ্ট্রের দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই পালন করতে হবে । তবে বৃদ্ধা আমাকে তাদের মত মানুষদের জন্য কিছু একটা করার আহ্বান জানান দিয়ে গেলÑ সেকথা মনে সুক্ষভাবে উদয় হতে লাগল।
কিন্তু আমি তো কলিযুগের মানুষ! নিজের খেয়ে বনের মহিষ তাড়ানো বোকামির সামিল-একথা গুরুজনরা পূর্বেই শিখিয়ে গেছে। আমি তাদের যোগ্য উত্তরসূরি হয়ে কি করে সেই প্রথা ভাঙ্গার দুঃসাহস দেখাই!
পরবর্তীতে ঐ বৃদ্ধার খোঁজ-খবর নেয়াও সম্ভব হয়নি সে মরে গেছে নাকি বেঁচে আছে? শরৎ বাবুর মত বলতেও পারছিনা যে.‘তার মরার খবর যখন পাই নাই,তখন এটা নিশ্চিত করে বলতে পারি যে, সে বেঁচে আছে।’কারণ বিশ্ব্য়ানের থাবায় আমরা যে সবাই থেতো হতে বসেছি।
এরপর প্রায় এক বছর অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। একদিন নাচের একটি ওয়ার্কশপে মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছিলাম দারিয়াপুরে। গন্তব্যের কিছুদূরে রাস্তার পাশে কিছুলোক হাত তুলে যানবাহনের গতিরোধ করছে। কাছে গিয়ে শুনতে পেলাম পাশে শোয়নো ময়লা-মলিন কাপড়ের ছাউনি দিয়ে ঘেরানো একটা লাশের দাফনের জন্য তাদের এ ভিক্ষাবৃত্তি।
তাদের বর্ণণায় বুঝতে বাকি রইল না বৃদ্ধার পরিচয়। আমি বাইকটা সাইড করতে দেখে মেয়ে বলল,বাবা, দেরী হবে না তো?
মেয়ের মুখের দিকে গ¤ী¢র হয়ে তাকিয়ে বললাম, তুমি ক্লাস ধরতে পারবে।
ভিক্ষুকদের একজনকে ডেকে বললাম, আপনারা গ্রামে সবাই মিলে কী ওনার কাপড়টা কিনতে পারতেন না?
সে আমার কথায় একটু ঢোক-চোক খেয়ে গেল। তারপর ঢুকি চিপে গলাটা ভিজে নিয়ে বলল, ভাই, হামি তো বিশকামলা খাটা মানুষ, আমার কথা কেটা শুনবে? যামার আছে তামরায় মাথা নাড়ায় না! ওদিনকা বিকালে জিউ গ্যাছে, কাইল্যার দিন-রাত গ্যাছে,আইজ্যা কত বেলা হয়াও কারও হ্যাট-উকাশ নাই। তাই হামি হামার ধরাণ কয়টাক নিয়া এখানে হাত তুল্যার নাকছি।
আমি বিমর্ষ চিত্তে কিছুক্ষণ একবার লাশের দিকে আরেকবার ওনার দিকে তাকাতে লাগলাম এবং ওদের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাটার জন্য ভেতরে ভেতরে অনুশোচনা হতে লাগল। সে আমার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
মেয়ের ডাকে ভিতরে তাড়া অনুভব করলাম। তাই ওনাকে কাছে ডেকে খুব ছোট করে বললাম, ভাই, আমি কাফনের কাপড়ের টাকাটা দিই, আপনি ওনার দ্রুত সৎকারের ব্যবস্থা করেন।
আমার কথা শুনে তার চোখে-মুখে নির্মল স্বস্থির আভাস দেখা গেল।
সে শুধু বলল, ভাইজান, আপনার মত মানুষ কয়জন আছে দুনিয়াত!
আমি বললাম, ওসব বলোনা! তুমি যা করছো তার তুলনায় আমারটা কিছুই না।
আমার মুখে ওর কাজের প্রশংসা শুনে চোখে-মুখে আনন্দ-হিল্লোল বইতে দেখলাম কিন্তু কোন উচ্ছ্বাস বেরিয়ে এলো না; শুধু জোরে সবাইকে শোনার উদ্দেশ্যে বলল, ভাইজান যে কী কয়!
আমি মুখ ফিরিয়ে নিজের কাজে চললাম। পিছন হতে শুধু শুনতে পেলাম, এ কাম হয়া গ্যাছে-গোটাও টেবিল-চেয়ার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ জাতীয় আরও খবর.......

খবরটি বেশী পড়া হয়েছে

Don`t copy text!